name
প্রথম পাতা মনের ঘুড়ি  

 

 

 

স্তব্ধতায় রহস্য নেই
সুচেতা মিশ্র

--- আসলে কী ডান্স ফ্লোরে এক পা তুলেই ছিলাম। তুমি শুধু হাত ধরে ঘুরিয়ে দিলে। বুভুক্ষার কোনো অন্তরাল ছিলনা, থাকেনা। ছিল দক্ষছাঁদ মোলায়েম। ঊষসী আলোয় যেমন অনাবিল। পূঞ্জ পূঞ্জ শব্দের খেলায় টইটম্বুর। ছলকে যাওয়ার আগে স্বাদ নেওয়া, নিজেকে ফিরে দেখাও। সত্যিকে উপেক্ষা করা কী সহজ? বলতেই পারি, মিলনডম্বর হাতছানি দিচ্ছিল বারবার। ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলাম জংগল, পাহাড়, লোকবসতি ঐক্যনিনাদে। কিন্তু ভুলতে পারোনি সেই বাজুবন্ধ যাকে শোকগাথা বললেও ভুল হবেনা কোনও। উথালপাথাল ঢেউ তুলতেই থাকে তোমার অস্থিমজ্জায়। দীর্ঘ-দীর্ঘ বছরের বনবাস শেষ হয়ে গেলেও রেশ তো থেকেই যায়। দিনভর পরস্পরকে ছুঁতে-চাওয়া খেলার নেশা শেষ করে দেওয়া হাতিভারী। বনবাসই বা বলছি কেন, বরং মনোবাস বলা যায় একে, যদিও শেষরক্ষা হোলনা, হয়না এভাবে। গলতি কারো নয় মিতা, এ বড় বিষম সময় আসোলেই।

 --- এই যে খুলে গেলাম, এর ভেতরের সত্যি জানাও জরুরী। কোনো প্রশ্রয় কী ছিলনা! একসাথে বৃদ্ধ ভাবনায় ধোঁওয়াচুমুক কি ঝড় তোলেনি, বলেনি কি নীরবছিন্ন সেই সুখ ওই দুইপেয়ালায়! ডাগর অন্ধকার উপেক্ষা করে নীলাম্বরি আঁচলের এক ঝলক তোমারই নির্মাণ, ছিলনা! স্তব্ধপ্রহরে ঝুলে থাকা গলাচাঁদ ঝরে ঝরে পড়লে উদ্ভাহু যে হবই সেকি অজানা ছিল? দুঃখবিহীণ দুঃখের বিলাস তিমির বিনাশী নয়, জানা কথা। হাতে অন্ধকার নিয়ে পথে বেড়োলে পথ চলার সহজ রাস্তাও ধরা ছোঁওয়ার বাইরেই থাকে, থাকেনা?

 --- আপাততঃ স্তব্ধতায়। পার ভাঙছে এখন স্তব্ধ প্রহর, ফিরবো অবশ্যই। পরাস্ত নিয়মে জড়িয়ে পরে অঙ্গীকারও অস্বীকার-বুদবুদে। সেইরকমই ঝপাঝপ নিভে যাওয়া জ্বলে যাওয়া। ভালো! দ্বিধা থেকেই উপেক্ষা, নামাবলী নিয়মের ষড়যন্ত্র রাঙিয়ে যাচ্ছে একের পর এক এক্কাদোক্কা ঘটনামালা। হঠাৎ রোদ্দুরের গায়ে সুইচ্ অন্-অফ্ করলে হলুদ মাথাধরাখয়েরী কিম্বা হিংসেসবুজ হয়ে ওঠে যেমন পরপর। বেরাদারের হাতে সঁপে দেওয়ায় ভাল তখন! নিশ্চঞ্চল বুকে ঝাঁক ঝাঁক সমুদ্র-চিল আছাড়ি -পিছাড়ি লেলিহান ভাবনায় তবু। অভিসন্ধির গেরুয়া প্রহর খুলে খুলে যায় জানলার ওপরে রাখা পরী অ্যাশট্রেতে, পুড়ে পরে আছে যেখানে ধূলো ধূলো সত্যকাম। হাত রাখলাম কাঁধের ওপর, বুলিয়ে দিচ্ছি পেকে ওঠা ধান্যশরীরে একটি দুটী আঙুল। বেহালা তোল, উৎসব শেষে মুখথুবড়ে পরে আছে রত্নাবলী কল্পদ্রুম। কোনো রঙ নেই এখন। নিভৃতে শর্বরী মীর।

 --- রং ছাড়া বেঁচে আছি। সেই সব রঙ যা ধন্ধে থাকেনা। ধন্ধের কারনেই রং ছাড়তে হলো, হয় এরকম কত। দুন্দুভী ফুলে যে পরিমান মধু থাকে সেটুকু চেটে নিতেই এই বিরহ কফি কাপ। তবু মানতে পারিনা। টং টং বাজে বর্তনী ভালবাসা। স্বেচ্ছাচারী ছোটে মুগ্ধ দিওয়ানার দিকে। লবঙ্গতেজে  ঢেকে যাওয়া ক্ষয়া কুড়ুনি ব্যাথার মত এই মুগ্ধতা। হলুদ বালিসে এখন মাথা রেখেছি। জানলার বাইরে তাকালে আকাশ চোখে পড়ে। ভরে নিচ্ছি নীল সুগন্ধী বুকভরে। সময় আছে, অ্যান্টিক মভ্ অস্বীকার করতেই পারি অনায়াসে। জাদুগরী বাঁশি বাজছেই বাজছেই বাজছেই।

 

লাট্টু
মু. নূরুল হাসান

পঁচিশতম জন্মদিনে এসে আমার মনে হয়, যদি পঞ্চাশ বছর বাঁচি, তবে অর্ধেক পথ এরই মাঝে পার হয়ে এসেছি।
বড় নির্দয়ভাবে এই ভাবনাটাই কেবল মাথার ভেতর লাটিমের মত ঘুরতে থাকে। কিছুক্ষন এদিক ওদিক ডিগবাজি খেতে খেতে একটা কেন্দ্রে এসে ভাবনাটা স্থির হয়, এবং একই কেন্দ্রে ঘুরপাক খায় বলে সেটা ক্রমশঃ গভীরে যেতে থাকে- আর সেখানে যেন কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে যায়, পঁচিশ, চব্বিশ, তারপর তেইশ বাইশ একুশ...।

সতেরতম জন্মদিনে ঠিক এরকম একটা ভাবনার উদয় হয়েছিল মনে। ধারণা হচ্ছে, সেদিনও সম্ভবত আজকের মতই কিছু খরচ না করা অলস সময় জমে গিয়েছিল। শীতের সকালে খুব আরাম নিয়ে রোদ পোহানোর মত করে আদুরে ভঙ্গিতে আমি তাই ভাবনার লাটিম চরিয়ে বেড়াই। মনে পড়তে থাকে- সে দিনেও আমার এমনি মনে হয়েছিল যে সতের বছর পার হয়ে এসেছি!
আজকের দিনের সাথে তার পার্থক্য একটাই, সামনের অর্ধেক জীবনের কথা তখন মাথায় এসে বসেনি।
এই রকমের ভাবনাগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে ফ্ল্যাশব্যাকের মত করে পুরনো স্মৃতিরা উঁকিঝুকি দেয়া শুরু করলে বেশ জমে ওঠে।
আমিও তাই ভাল মতন জমিয়ে যাই। মস্তিষ্কের মজাটাই এই- সে প্রায় সব স্মৃতিই জমা করে রাখে। ডেস্কটপে ফেলে রাখা আনইউজড আইকনের মত মাঝে কিছু কিছু ডিলিট করে দেয় বটে, তবে সেটা শিফট+ডিলিট নয় কোনমতেই। তাই খানিকটা চেষ্টা করলে সেসব রিট্রিভ করা যায়।
আর এই রিট্রিভের প্রক্রিয়াটা অনেকটা সার বেঁধে সাজিয়ে রাখা তাসের মতন, একটা টোকা দিলেই সরসর করে একের পর এক সব গড়িয়ে পড়তে থাকে।
মনের ভেতর গড়িয়ে পড়া ফ্ল্যাশব্যাকগুলো থেকে হঠাৎ হঠাৎ দু'একটাকে পওজ করে থামিয়ে দেই। ডানে বামে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ত্রিমাত্রিক ভঙ্গিতে দেখি তাদের। না না, চতুর্মাত্রিক হবে দেখাটা, সময়ও যে থাকে সাথে! দেখতে দেখতে ভাবতেও ভাল লাগে- এতদিন পরেও তারা প্রায় একই রকম অনুভূতির জন্ম দেয় মনে, ঠিক প্রথমার মতন। কখনো টুপুর টাপুর কখনো মুষলধারে হাসতে থাকি আমি, অথবা কখনো চুপ করে নীরব জোছনায় ভেসে যাই।

তো, বলছিলাম, সতেরতম জন্মদিনটির কথা। সেদিন খানিকটা থমকে পেছনে তাকিয়েছিলাম, আর ঠিক আট বছর বাদে আজ আবার সময় হলো তাকানোর।

সতের মনে আছে, তবে আঠারো নেই একদমই।
অথচ আঠারো নিয়ে কতই না মাতামাতি- গল্পে কবিতায় আর গানে, এদেশের বুকে আঠারো আসে নেমে। কিন্তু কেমন করে আঠারোকেই অবহেলা করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। একবার নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকাল বেলা ট্রেনে চেপেছিলাম, জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে কাঁচের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি! হঠাৎ চমকে ঘুম ভেঙ্গে দেখি, স্টেশান পার হয়ে গেছে আগেই, অথচ নামা হয় নি আমার।
ঠিক একই চমক নিয়ে আজ আঠারোর কথা ভাবি। কোন আবেগ কিংবা আবেশে মাতা হলো না তেমন করে। কাঠঠোকরা পাখির মত একাগ্রতায় ঠক ঠক করে গুনে ফেলেছি আঠারো ঊনিশ বিশ- , কোনখানে থামবার কথা মনে হয়নি একবারো।
আজ তাই অল্প স্বল্প দুঃখ বোধ হয়- যদি মনে পড়তো- শেরপা তেনজিং এর মতন গর্বিত ভঙ্গিতে না হলেও, খানিকটা সংকোচ নিয়ে আঠারোর বুকে একটা পতাকা গেঁথে দেয়া যেত।

শহুরে জীবনের কল ঘুরিয়ে মাঝে মাঝেই এরকম শাওয়ারে ভিজে নিতে ভাল লাগে, চোখ বুজে নীপবনের শান্তি খুঁজে নেবার চেষ্টা চালানো যায়।

আপাতত লাটিম থেমে যায়, হাতের সুতো তাতে জড়িয়ে নিতে নিতে ভাবি- আরো বছর পঁচিশেক এরকম নবধারাজলে ভিজতে পারলে মন্দ হয় না বটে!