name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

 

দীপায়ন ভট্টাচার্য

রক্তকরবীর পাগল গায়ক

 

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় বলেই রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ লেখেন। মানুষের ভিড় ভেঙে জীবনের পথে হেঁটে যেতে যেতে নানা বেলার আলোর পরিবর্তনের মত অবস্থান তাঁর চিত্তপটে যে রেখা, যে রঙের আঁচড় ছোঁয়ায় অজস্র অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ের উদ্দেশ্যে সেটাকেই তিনি মেলে ধরেন। একক হৃদয়ের রক্তপাত অনেক হৃদয়কে আলোড়িত করে কি না হয়তো নীরবে লক্ষ্য করেন সেটাই। এই সভ্যতা, এই মানবসমাজকে নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ নেই – সদ্ভাবনা, দুর্ভাবনা সবই তাঁর মধ্যে রয়েছে। তবে মোটের ওপর সেটা কল্যাণ ভাবনা। মানুষের কিছু অবিশ্বাস্য পতন নিয়ে খেদ থাকলেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানোর তিলমাত্র ভাবনাও তাঁর মনে ঠাঁই পায়নি। তাই ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের উপসংহার টানতে গিয়ে তিনি বলেছেন – “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয় তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ বলে মনে করি।” সুতরাং নিজের যে কোন সৃষ্টির উপসংহারে তিনি যে মানুষের বিজয়কেতন উড়িয়ে দেবেন, এই তো স্বাভাবিক। কীভাবে ব্যতিক্রম হয়নি সে ধারণা নিতে গিয়ে ‘রক্তকরবী’র কাহিনিটা একবার আওড়ে নেওয়া ভাল।

যক্ষপুরীতে শ্রমিকদল মাটির গভীর থেকে সোনা উত্তোলনের কাজে নিযুক্ত। এখানকার নানা নিয়মনিগড় ও ছকে বাঁধা জীবনধারার মধ্যে এক ব্যতিক্রমী আলো – রক্তকরবীর আভরণে ভূষিত নন্দিনী। এখানকার অনেকেই নন্দিনীর মোহমুগ্ধ, নন্দিনী কিন্তু প্রীতিমুগ্ধ রঞ্জনের। অন্যদিকে সে যক্ষপুরীর শীর্ষ-ক্ষমতাসীন মকররাজের সাথেও মিতালি পাতিয়েছে। রাজাকে সে জালের আড়াল থেকে বেরিয়ে খোলা মাঠে নেমে আসবার আহ্বান জানায়। কিন্তু নেপথ্যচারী রাজা এ আহ্বানে কান দেননা। তবে তিনিও নন্দিনীর মায়ায় পড়েছেন। তাই এই অসীম শক্তিধর রাজা রঞ্জনকে সাব্যস্ত করেছেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে। রঞ্জন যৌবনের দূত, আর রাজা শক্তির প্রতিভূ। যক্ষপুরীর শ্রমিকেরা নিস্তেজ – তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণার চাবুক খেয়ে কাজ করে, আবার সবকিছু বিস্মৃত হতে মদের শরণাপন্ন হয়। সর্দারের কঠোর পাহারায় এবং যক্ষপুরী ছেড়ে কোথাও সরে পড়তে পারেনা। এদের ভাল ভাল কথা বলা আর মধুক্ষরা হরিনাম শোনানোর জন্যে আছে কেনারাম গোঁসাই। রঞ্জন এসে শ্রমভার পীড়িত শ্রমিকদের মধ্যে দাঁড়ালে তারা যে তেজ ফিরে পেয়ে রাজার শাসন ছিঁড়ে পেতে চাইবে। নন্দিনীকে রক্তকরবীর অলংকারে সাজতে দেখে রাজার মনে বিচিত্র ভাবের সঞ্চার হয়। কখনো তিনি চান সেই অলঙ্কার ছিঁড়ে ফেলতে, আবার নন্দিনী নিজে যদি তাঁকে রক্তকরবীর মঞ্জরী পরিয়ে দেয়, তখন চান সাদরে গ্রহন করতে। এভাবে নন্দিনীর সাথে সামঞ্জস্য বিধানের এক কল্পনা তার মনের কোথাও কোথাও আল্‌তোভাবে উড়ে বেড়াতে থাকে। কিন্তু নন্দিনী যখন জানায় – একজন মানুষের পছন্দকে মূল্য দিয়ে সে ওই রক্তকরবীর সাজ পরেছে, তখন সেই নেপথ্যস্থিত ভাগ্যবান অর্থাৎ রঞ্জনকে তাঁর প্রবল শক্তিপ্রয়োগে হত্যা করে ফেলেন তিনি। কিন্তু রঞ্জনের মৃতদেহ দেখে নন্দিনীর হাহাকারে রাজার সম্বিত ফেরে। অজ্ঞাতসারে যৌবনকে হত্যার অনুশোচনায় রাজাও নিজেকে ভাঙতে শুরু করেন। ভেঙে ফেলেন নিজের ধ্বজা। ছুটে যান নিজের বন্দীশালার দরজা ভাঙতে। এতদিন পরে প্রাণের সন্ধান পেয়ে যেন তিনি নিজের বন্দীত্ব ঘুচিয়ে পথে বের হন।

এই কাহিনীর মধ্যে একজন পাগলের জন্যেও অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নাটকের বিষাদ-মধুর গানগুলি সেই সকলকে শোনায়। কোথা থেকে উঠে আসে এই গানের বাষ্প? তার জীবনপ্রবাহ কোথায় আশ্লিষ্ট রয়েছে বিষাদের শৈবালদামে? বিশু পাগল যে গান গায়, সেই গাওয়াটাই কি ওর পাগলামি? তাহলে যখন সে পাগল ছিলনা, তখন কি তার গানও ছিলনা? তার জীবন মন্থন করে যে বিষাদ উত্থিত হয়, সেটাই কি তার গানের রসদ? ফাগুলালের কথা থেকে বোঝা যায়, বিশু এমন কিছু কথা বলে, তার মধ্যে এমন কিছ উপমা থাকে – সাধারন মানুষের কাছে যা সহজাত নয়। ঐ বঙ্কিম কথাগুলো বলে তুলনা করে বলেই কি সে পাগল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে গেলে নিজস্ব অতীতের আলোয় ফেলে বিশু পাগলকে দেখা দরকার। নন্দিনীর সাথে বিশুর আলাপচারীতায় তথ্য পাওয়া গেল – এক নারীর টানে বিশু যক্ষপুরীর সুড়ঙ্গ খোদাইয়ের কাজে এসে যোগ দিয়েছিল। সে যখন পশ্চিমের জানলা দিয়ে মেঘের স্বর্ণপুরী দেখে, তখন সেই নারীর চোখে পড়ে সর্দারের সোনার চূড়া। বিশুর নজরের চেয়ে তার নজর ছিল অনেক নীচে, কিন্তু অনেকটা বস্তুকেন্দ্রিক। বিশুর মন টেনেছিল প্রকৃতির অপ্রাকৃত লাবণ্য, সে নারীর মনোযোগ গ্রাস করেছিল সোনার দুর্মূল্য বর্ণচ্ছটা। সেই নারী যেতে চেয়েছিল ওই স্বর্ণমিনারে, বিশু তাকে নিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু তাতে বিশুর ঘোরও ভেঙে গিয়েছিল। তাহলে একজন নারী বিশুকে ঘোরের মধ্যে ফেলেছিল সে কথা স্পষ্ট। সেই নারী যে তার স্ত্রী – নাটক ধরে এগোতে গিয়ে সে তথ্য অবগত হওয়া গেছে। এক সময় খোদাইকরদের ভেতরের খবর জানবার জন্যে সর্দারেরা তাকে চর হিসেবে নিয়োগ করেছিল। কিন্তু ওই বৃত্তির সাথে তার অন্তরের কোন যোগ ছিলনা। হয়তো সেই গাফিলতি লক্ষ্য করেই পরবর্তীকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পদাবনতি ঘটানো হয়েছে – তাকে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে খোদাইকরদের কাজে। যতদিন সে চরবৃত্তিতে নিযুক্ত ছিল, ততদিন ওই স্ত্রী তার সঙ্গেই ছিল। সে মেয়ের তখন ডাক পড়তো সদার্নীদের তাস খেলার আসরে। প্রথমে সোনার টান, তারপর উচ্চবিত্তের সঙ্গদোষ – বিশুর সাথে তার স্ত্রী-র মানসিক বিছিন্নতার সূত্রপাত এখান থেকেই। পদাবনত হয়ে বিশু যখন থেকে খোদাইকরদের সঙ্গে ভিড়ল, তার স্ত্রীও তখন থেকে তার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গেল। তারপর সংসারে একজন একক অবনত মানুষের যে পরিনাম হবার কথা, বিশুর নিশ্চয়ই তাই হয়েছে। জীবনে তার তখন পেশাগত সন্তুষ্টি নেই, আবার এই অসন্তুষ্টির জ্বালা ভাগ করে নেবার মত নেই কোন সহানুভূতিশীল মন। যে এই ব্যাথার ভাগ গ্রহণ করে তার জীবনযাপন সহজ করতে পারত, সেই তাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। প্রত্যাশার তুলনায় নিজেকে অপাংক্তেয় হয়ে যেতে দেখলেই তো মানুষ অসঙ্গত আচরণ করতে থাকে। আগেকার জীবনের সাথে তার আচার-আচরণকে মেলানো যায়নি বলেই হয়তো অন্যদের কাছ থেকে তার ‘পাগল’ উপাধিটি জুটেছে। তারপর থেকে হয়তো তার অন্তরনিবাসী ব্যথাগুলো সংগীত হয়ে যক্ষপুরীর সহমর্মীদের কানে কানে বেজেছে। একমাত্র ‘অগমপারের দূতী’ হয়ে নন্দিনী যখন থেকে যক্ষপুরীতে এল, বিশু যেন এক সমুদ্রের সন্ধান পেয়ে গেল। নন্দিনীর কাছে গান পৌঁছে দেওয়াকে তখন থেকে নিজের নিত্যকর্ম করে নিল। রঞ্জনের সাথে নন্দিনীর সম্পর্কের কথা বিশুও জানে। হয়তো তাতে তার মন আরেকটু বেদনার্ত হয়, কিন্তু সেই সম্পর্ককে ভাঙতে একটুও ইচ্ছে করেনা তার। বরং সে নিজের বেদনা গানে ঢেকেও নন্দিনীকে উৎসাহ যোগায়। কাছের পাওনা নিয়ে বাসনা করবার দিন তার ফুরিয়েছে, দূরের পাওনা নিয়ে আকাঙ্খার চিরদুঃখের আলোটি যে তার নন্দিনী। সর্দারেরা এই পাগলকে সন্দেহের চোখে দেখে। হয়তো এ একদিন কোন আশংকাজনক কান্ড ঘটাবে বলেই তাদের ধারণা। নন্দিনীর সাথে তার মেলামেশা এই ধারণাকেই ইন্ধন যুগিয়েছে। তবে বিশুকে তার সহকর্মীরা কিন্তু তাচ্ছিল্যসূচক ‘পাগল’ বলে ডাকেনা বরং ‘পাগল ভাই’ বলে সে ডাকের সাথে আন্তরিকতা মিশিয়ে দেয়। অন্য সব খোদাইকরের মত বিশু কেবল সুরায় অবগাহন করে না, কারন-বারির কারনগুলো বোঝে, নির্বিবাদে সব হজম না করে মাঝে মাঝে যে কথাগুলো বলে সেগুলো তার গানের মত সুরেলা নয়। কখনো কখনো যক্ষপুরীর সর্বনেশে দিকগুলো অন্যদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। ফাগুলাল বা চন্দ্রার মত অনেকেই তার সংগীতমুগ্ধ – তাদের অনুরোধেও সে নিজের গানের ভান্ডার খুলে দেয়; তবে তা উজাড় করে দেয় একমাত্র নন্দিনীর কাছে। ওই নন্দিনী এবং তার প্রিয়জন রঞ্জনের জন্যেই একদিন বিশুকে বিপদে পড়তে হয়। রঞ্জন আসার খবর যখন যক্ষপুরীতে রটে যায়, তখন সর্দার চায় যেকোন মূল্যে রঞ্জনের সেখানে আসা ঠেকাতে। কারন রঞ্জন এসে পড়লে শ্রমিকেরা বেহাত হয়ে যেতে পারে। একদিন বিশুও নিখোঁজ হয়ে যায়। রাজার লোকজনেরা রঞ্জনকে চেনানোর জন্যে তাকে নিয়ে গিয়ে নিপীড়ন চালায়। প্রহরীর কড়া পাহারায় নিরুদ্দেশ যাত্রারত বিশুর দেখা পেয়ে নন্দিনী অবশেষে উপলব্ধি করে বিশুকে তার অনেক কিছু দেবার ছিল। কিছু না পেয়েও বিশু চায় নন্দিনীর সাথে রঞ্জনের মিলন। কিন্তু তাতেও নন্দিনী যেন আর প্রত্যাশানুযায়ী সুখী হবে না। বিশুর নিরুদ্দিষ্ট হওয়া যক্ষপুরীর খোদাইকরদের মধ্যে জাগায় উত্তেজনা। কেউ কেউ এর পেছনেও দেখে নন্দিনীর ষড়যন্ত্র। তারা চায় বিশুর মুক্তি। এইখানটাতে শ্রমিক মহলে বিশুর প্রভাবের ব্যাপকতা অনুভব করা যায়। পরে যখন প্রবল শক্তির অপপ্রয়োগে রঞ্জনকে নিহত করেও নন্দিনীর যাদুস্পর্শে রাজার চৈতন্যোদয় হয়, তখন কারিগরেরা বন্দীশালা ভেঙে ফেললে বিশুরও মুক্তি ঘটে। সে তার একলা মহাযাত্রার জন্যে তৈরী হয়। শেষ মুক্তিযুদ্ধে সবাই তখন চলেছে লড়তে।

‘রক্তকরবী’তে মোট আটটি গানের মধ্যে বিশুই গেয়েছে ছয়টি। তার মধ্যে চারটি উপলব্ধির গান, একটি মৃত্যুচেতনার এবং একটি ফসলকাটার গান। বিশুর গানগুলির মধ্যে চারটি গানের শ্রোতা ছিল কেবল নন্দিনী। একটি গানে চন্দ্রা ও ফাগুলাল এবং আরেকটি গানে চন্দ্রা, ফাগুলাল আর গোকুল।

এই নাটকে চন্দ্রা আর ফাগুলাল গান শোনার আগ্রহে পথ থেকে বিশুকে ডেকে নিয়েছে। তাদের শোনানোর জন্যে বিশু গেয়েছে – ‘মোর স্বপনতরীর কে তুই নেয়ে...।’

নেশার হাওয়ায় তার পাগল প্রান গান গেয়ে চলে। স্বপনতরীর মাঝি তাকে সব ভুলিয়ে সুদূর ঘাটে নিয়ে যাবে। ভাবনাগুলো তার পেছনে পড়ে থাকে। সে নেয়ে নিজের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করে দৃষ্টিপাতে প্রাণকে নন্দিত করুক। চন্দ্রা ভাবে – নন্দিনীই বুঝি ওর স্বপনতরীর নেয়ে। বিশু এই যক্ষপুরীর ধরাবাঁধা কাজ থেকে মুক্তি খোঁজে প্রকৃতির মধ্যে, মুক্তি খোঁজে গানে। সমগোত্রীয়দের অন্তরাত্মা হাটের মদ নিয়ে মাতামাতি করছে দেখে তার গানে জাগে প্রবল আক্ষেপের ঢেউ। সে গায় – ‘তোর প্রানের রস তো শুকিয়ে গেল ওরে।’ এই গানে এখানকার যন্ত্রবৎ মানুষদের উদ্দেশ্যে। প্রানের রস শুকিয়ে গেলে যারা মরণ-রসে পেয়ালা ভরে নেয়, চিতার আগুনে যাদের জীবনের সব জ্বালা মেটে, অট্টহাসিতে যারা শূন্যকে রঙিন করে যায় – তাদের সূর্য মেঘে ঢাকা। অকাজেই যদি দিনাবসান হয় তো আসুক সে তিমিরাবৃত রাত। লুপ্তি নেশার চরম সাথী হয়ে ক্লান্ত আঁখিকে যে ঢেকে দেবে। ঘটনাচক্রে বিশুও তাদের একজন। এই গানে নিজেদের তুচ্ছ জীবনযাপনের প্রতি তার খেদ যেন ঝরে পড়ে। এরপর এসেছে বিশুর বহু আকাঙ্খিত নন্দিনীকে গান শোনানোর লগ্ন। হতাশার আলিঙ্গন থেকে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে সে গায় – ‘তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো ওগো ঘুম ভাঙানিয়া।' নন্দিনীই একাধারে তার ঘুম-ভাঙানিয়া আর দুখ-জাগানিয়া। আঁধার ঘিরে আসাতে পাখি যখন নীরে ফিরে আসে, তরী ফিরে আসে তীরে – তখনও তার হৃদয়ের বিরাম নেই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তার অশ্রুমোচন চলে। নন্দিনী সুধাময় স্পর্শে প্রাণ ভরিয়ে আড়ালে সরে যায়। বুঝি তার ব্যথার আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকে সে। এই গান শোনার পরই নন্দিনী তার মনের দুঃখের হদিশ পায়। সে তখন রঞ্জনের কথা বিশুর কাছে উজাড় করে দেয়। শুনে বিশু গান গায় – ‘ও চাঁদ চোখের জলে লাগলো জোয়ার দুখের পারাবারে।’ সেই অশ্রুজলে এ পারের সাথে ওপার কানাকানি করে। বিশুর চেনা কূলে বাঁধা তরী বাঁধন খুলে অকূলে ভেসে গেল। এ গানের পর নন্দিনীর অনেক কথা জেনে নিয়েছে বিশু। নন্দিনী ওই ভয়ের রাজার কাছে কেমন নির্ভয়, সে তা অন্দরমহলে কেমন স্বচ্ছন্দে পৌঁছে যায়, সুপ্রাচীন ওই শক্তিরাজ নন্দিনীর কাছে কতটা সহজ – এসব কথা বিশু শোনে। নন্দিনীর অন্তরমথিত ভালবাসার গানের মুগ্ধ শ্রোতা হয় বিশু। আবার এক সময় রঞ্জনমোহিত নন্দিনীকে বিশু শোনায় ‘যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে’ গানটি। অপেক্ষারত কোন প্রিয়জনকে যে মনে পড়েছে নন্দিনীর। কোন্‌ অস্ফুট প্রদোষে তাকে দেখেছিল সে, আজও যেন পথপ্রান্তে রয়েছে সে অপেক্ষায়। আজ সে চাঁদকে আলোর সংগীত বরণ করা হবে – রাতের মুখের আঁধার-ওড়না সে খুলে দেবে। শুক্লনিশার সেই আলোতে মুহূর্তের মধ্যে সব আভরণ খসে যাবে। রঞ্জন এবং নন্দিনীর পারস্পরিক প্রতীক্ষা এই গানের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই গান শোনার পরিতৃপ্তিতে নন্দিনীও বিশু পাগলকে তার কাছ থেকে কতটা বঞ্চিত থাকতে হয়েছে সে কথা ভাবতে পেরেছে। আরো অনেক পরে নন্দিনীকে বিশু আগাম শুভেচ্ছা জানিয়েছে রঞ্জনের সাথে মিলিত হবার জন্যে। প্রহরী পরিবৃত হয়ে বিশু তখন বন্দীশালার পথে। তখন মাঠে মাঠে ধ্বনিত হচ্ছিল ফসল কাটার সুর। তার সাথে সাযুজ্য রেখে বিশুও গেয়ে উঠেছে – ‘শেষ ফলনের ফসল এবার কেটে লও বাঁধো আঁটি।’ ফসল ঘরে ঘরে যাবে, যা ঘরে নেবার নয় তা পড়ে থাকবে। এই গান যেন বিশুর হৃদয়াভ্যন্তরের সুপ্ত ব্যথার প্রকাশ। রঞ্জনকে নন্দিনী গ্রহন করবে হৃদয়ের অন্দরমহলের গোলাঘরে। বিশুও সৃজিত হয়েছিল জগতের মাঠে, ফসল ধরে রাখার কাজে ব্যাপৃত ছিল সেও। কিন্তু তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ফসলের আঁটিতে তার স্থান হবে না। বিশু তার দীর্ঘশ্বাস এই গানে মিশিয়ে রাখার পর নাটক থেকেই কিছুক্ষনের জন্যে আড়াল হয়ে গিয়েছে। পরিশেষে অন্তিম যুদ্ধলগ্নে আবার তার দেখা মিলেছে। কিন্তু তখন তার যুদ্ধের সময়, গানের সময় নয়।

 

 

 

 

 

 

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অশেষ দাস

গৌতম রায়

দীপায়ন ভট্টাচার্য