name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

নিঘাত সুলতানা তিথি
রাহেলা

অন্যান্যদের গল্প

সুমেরু মুখোপাধ্যায়

নিঘাত সুলতানা তিথি

বিপুল দাস

হাসান মোরশেদ

 

tithi

--রাহেলা,অজুর পানিটা দিয়ে যাও তো।

হঠা ডাকে সচকিত হন রাহেলা বেগম জমে যাওয়া পায়ে ধীর গতিতে হেঁটে যান স্বামীর কাছে অপলক তাকিয়ে থাকেনভুলে যান স্বামীর আদেশফের ডাক পড়ে

-- কি দেখো তাকিয়ে, কথা কানে যায় না? তুমি সারা দিন থাকো কোন ধ্যানে? নাহ, আমার প্রথম বউ এরকম বেয়াদবী আমার সাথে কখনও করে নি, কিসের ধ্যান যে কর সারাদিন? আজকালকার নষ্টচিন্তার মেয়েছেলে ...

রাহেলা নিজের অপরাধের মাত্রা বোঝেন শান্ত গলায় বলে,

-- আজকে শরীলটা ভালো নেই, তাই কাজে ভুল হয়ে যাচ্ছে, কিছু মনে করবেন না আমি এক্ষনি পানি আনছি

রাহেলা ওজুর পানি স্বামীর সামনে রাখতেই সাথে সাথে টান পড়ে হাতে

-- কি করেন? ছাড়েনএখন না নামাজ পড়বেন!

রোমান্টিক হবার চেষ্টা ব্যর্থ হতে দেখে জামাল সাহেব বোঝেন অল্প বয়েসী বউয়ের সাথে কঠিন করে কথা বলাটা ভুল হয়েছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামাজে বসেন তিনি

রাহেলা বেগম রান্নাঘরে ঢুকে আবার নিজের চিন্তার জগতে ডুব দেন আজ তার কি যে হলো ... কেবল পুরনো কথা গুলো এসে ভীড় করছে মনের মধ্যে চুলায় ভাত ফুটতে থাকে ... রাহেলা বেগম এক নিমিষে রাহুহয়ে ভাবতে থাকেন একই সাথে সুখ অথবা দুখ স্ম্বতি

সুন্দরী রাহেলা নিজের প্রতি সবার আকর্ষন খুব ভালো করেই টের পায় সৌন্দর্যের অহংকারে তাচ্ছিল্যে এড়িয়ে চলে সকলকে কিন্তু কি করেই যেন ভালো লেগে গেলো বড় ভাইয়ের এক বন্ধু, আরমানকে। কি হ্যান্ডসাম দেখতে! তার মত সুন্দরীর জন্য যোগ্য পাত্র আর কে হতে পারে? চুরি চুরি প্রেমে বেশ কেটে যাচ্ছিলো দিন কিন্তু একদিন ধরা পড়তেই হলো আর সাথে সাথেই কড়া হুমকী বড় ভাইয়ের আর কোন দিন ও পথে পা বাড়িয়েছিস তো ... কেন বুঝিস না ও ভালো ছেলে না মোটেই! সতেরো বছরের মন ছিলো অস্থির-চঞ্চল, বাসার কেউ মানবে না আগে থেকেই জানত সে এদিকে আরমানও তাগাদা দিচ্ছিলোরাহেলা মনস্থির করার জন্য আর বেশি সময় তাই নিলো না বিয়ে করে ফেললো পালিয়ে বাপের বাড়িতে আর ফেরা হলো না তার, এক রকম অবাঞ্ছিতই করা হলো তাকে

রাহেলা প্রবেশ করলো তার নিজের নতুন সংসারে তার স্বামী আরমান অনাথ এক সময় অবস্থাসম্পন্ন পরিবার ছিলো যার চিহ্ন রূপে রয়ে গিয়েছে বিশাল বাড়িটা একমাত্র বোনটার বিয়ে হয়ে গিয়েছে গত বছর খালি বাড়িতে রাহেলা একেবারে নিজের মত করে শুরু করলো তার সাধের সংসার বিয়ের ঠিক পরের কটা দিন কেটে গেলো স্বর্গের মত সুখে কটা দিন, মাত্রই হাতে গোনা কটা দিনই এরপর রাহেলার স্বপ্নের হ্যান্ডসাম নায়কের ভিলেনের মত রূপ বেরিয়ে এলো পারিবারিক ব্যবসা করছে বলে যে কথা বিয়ের আগে বলেছিলো আরমান তার সবটাই মিথ্যা বলে জানা গেলো সেই সাথে শুরু হলো কিছুদিন আগে বড় ভাইয়ের মুখে শোনা কথাগুলোর বাস্তবায়ন অনেক রাতে মদ্যপ হয়ে বাড়ি ফেরা, কখনও বা না ফেরা, খারাপ পাড়ায় যায় বলেও শোনা যায় মানুষের মুখেসবটা রাহেলা বিশ্বাস করে না অনেক রাত অবধি একলা ঘরে ভয়ে ভয়ে স্বামীর জন্যে অপেক্ষা করে এক সময় শ্বশুরের রেখে যাওয়া ব্যাংক ব্যালেন্স ফুরিয়ে যেতে থাকে। একে একে ঘরের জিনিস বিক্রি করেও সামলানো যায়না নিত্য দিনের চাহিদা দিনের পর দিন রাহেলা চেষ্টা করে যায় স্বামীকে শোধরাবার কিন্তু দিনগুলোই কেটে যায় কেবল, বদল হয় না কিছুই সব দেখে শুনে রাহেলা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, বিশ্বাস হয় না সত্যি এমন ঘটে চলেছে তার জীবনে আর কিছু দিন যায়, এরই মাঝে ফুটফুটে এক মেয়ে জন্ম নেয় তাদের ঘরে রাহেলা তাকে বুকে চেপে রাখেসব ভুলে তাকে অবলম্বন করে বাঁচতে চায় কিন্তু সেই অবলম্বনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নতুন অশান্তি কেন? না, সে যে মেয়ে! হোক শিশু, মেয়েমানুষ তো!

মেয়ের বয়স বাড়ে - এক বছর, দুই বছর করে তিন বছর, কিন্তু বাড়ে না শরীর অপুষ্টিতে রুগ্ন হয়ে যাওয়া ছোট্ট শরীর রাহেলা আর্তনাদ করে স্বামীর কাছে বলে,

-- একটা কিছু কর, এইভাবে বসে থেকে থেকে না খেয়ে না দেয়ে আমাদের হয়তো আর কিছুদিন জীবন কেটে যাবে, কিন্তু এই শিশুটার কথা ভাবো, সে আমাদের সন্তান!

আরমানের মদের গন্ধওয়ালা মুখ থেকে অদ্ভুত কিছু শব্দ বেরোয় জবাবে অস্ফুটে বলে,

--হুঁ ... সন্তান ... মেয়ে বাচ্চা দিয়ে আমি কি করব? তুমিই কাজ করে খাওয়াও তোমার সন্তানকে

রাহেলার মুখে কথা সরে না দিন দিন কতখানি অমানুষ হয়ে উঠেছে তার স্বামী স্পষ্ট বুঝতে পারে নিজের জন্য নয়, কোলের শিশুটার কচি মুখের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে উঠে তার বুকের ভেতরটা বড় অভিমান হয় নিজের ওপরকেন বাবা-মার কথা না শুনে সে বিয়ে করেছিল এই অমানুষটাকে? কেন তার আর পড়ালেখা করা হলো না? যে মেয়ের জন্য পাগল হয়ে ছিল এত মানুষ, আজ তার জীবনের এই দশা! রাহেলার চোখ থেকে ক্রমাগত অশ্রু ঝরে পড়তে থাকে। শত শত প্রশ্নে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকেনিজের হাতে একটা টাকা নেই রাহেলা বাস্তবিকই কি করবে খুঁজে পায় না হঠা মনে পড়ে বাবার বাড়ি থেকে চলে আসবার সময় নিয়ে আসা মায়ের কিছু গয়নার কথা, নিজের ছোট্ট ট্রাংটায় তালা মেরে যত্ন করে রেখে দিয়েছেদৌড়ে ট্রাংক খুলেই থম হয়ে যায়। নেই! এক নিমিষে বুঝে ফেলে কি ঘটেছে মাথায় রক্ত উঠে যায় তার ভেবে পায় না একটা মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে নিজের বউ আর বাচ্চাকে না খাইয়ে নিজের ফুর্তির টাকা যোগায় আজ একটা কিছু রফা করবেই স্বামীর সঙ্গেগোঁজ হয়ে বসে থাকে আরমানের ফেরার অপেক্ষায় রাত বাড়ে এক সময় আরমানের খটখটি শোনা যায় দরজা খুলে রাহেলা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, আরমান একা নেই। নিজের সঙ্গে আরেকজন মেয়েমানুষ নিয়ে এসেছে! লোকমুখে শুনেছিলো কিন্তু এই কথাটা রাহেলা কখনো বিশ্বাস করে নি আজ আরমান অনেক শান্ত মেজাজে আছে, ঠান্ডা মাথায় ঠান্ডা গলায় দ্বিধাহীনভাবে রাহেলাকে তাই বলতে বাধেনা,

-- আমি অনেক ভেবে দেখেছি তোমার আমার সংসার করার আর কোন দরকার নাই ... রোজ রোজ তোমার জ্ঞানী জ্ঞানী উপদেশ শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত আমি নিজের জীবনের তালই রাখতে পারি না আরো বাড়তি দুইটা মানুষ! শোন রাহেলা, তোমার মেয়েকে নিয়ে তুমি কালকে চলে যাবা তোমার বাপের বাড়িআমি একলা শান্তিতে, ফুর্তিতে জীবন কাটাবো মেয়েমানুষের দরকার হলে আমার ময়নাপাখীদের এইখানে আমার বাসায় নিয়ে আসবো

সাথের মেয়েমানুষটিকে রাহেলার সামনেই জড়িয়ে ধরে পাশের ঘরে ঢুকে যায় আরমান। রাহেলার মুখে কোন কথা সরে না হাঁ করে তাকিয়ে থাকে স্বামীর চলে যাবার দিকে অবিশ্বস্ত, বড় অবিশ্বস্ত মনে হয় পৃথিবীটাকে কতটা সময় চলে গেছে খেয়াল হয় পাশের ঘরের আওয়াজে। চটকা ভেঙে পাথর রাহেলা ছুটে যায় মেয়ের দিকে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জাপটে ধরে তাকে, ভেঙে পড়ে মেঝের ওপর ঝড়ে ওপড়ানো গাছের মতো। চিকার করে কাঁদতে থাকে সমস্ত শক্তি নিশেঃষিত হলে একের পর এক বিভীষিকা চোখের ওপর ভাসতে থাকে। পাশের ঘর থেকে হাসির শব্দ খান খান হয়ে ছড়িয়ে পরে অন্ধকারে।

কেমন করে কেটেছিলো ওই বিভৎস রাত, আজ ভেবে তার কোন কূল পায় না রাহেলা পরদিন সকাল হবার সাথে সাথেই ছুটে গিয়েছিলো বাপের বাড়িতেসংসার ভাঙ্গার জন্য কোন কষ্ট নয়, বাস্তবিক সে যেন মুক্তি পেয়েছিলো অসুস্থ এক জীবন থেকে বহুদিন পর নিজের চেনা পরিবেশে বাবা-মা আর ভাইয়ের সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কথা বলে সে ছোট্ট মেয়ে নীলা বড় হতে থাকে একটু একটু করে তারও কিছুদিন পর ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে সে কি আনন্দ রাহেলার! কদিনের জন্য ভুলেই যায় নিজের অভিশপ্ত জীবনের কথা বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়,নতুন ভাবী আসে ঘরে বিয়ে উপলক্ষ্যে পাওয়া আনন্দ বেদনায় পরিণত হতে সময় লাগে না খুব বেশি দিন নতুন ভাবী নিত্য খোটা ছন্দপতন ঘটাতে থাকে দিনযাপনে। নিজের বাবার বাড়িতে প্রতি পদে পদে অপমানিত হতে হতে রাহেলার জীবন আবার দুর্বিষহ হয়ে উঠে ইচ্ছা করে আবার পড়াশোনা করে চাকরী করে বাঁচতে মেয়েটাকে যেন তার মতো অবস্থায় না পড়তে হয়। কিন্তু পড়ার খরচটাই বা দিবে কে?

অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়, এইখানে এইভাবে আর নয় কিছু একটা করবে একদিন ভাইয়ের ঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভাবীর কথা কানে আসে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে অবাক হয় রাহেলা একটু পরেই বুঝতে পারে আসল ঘটনা পয়ষট্টি বছরের এক বিপত্নীক বৃদ্ধ. তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, সবাই বিবাহিত ভাবী চাইছে এই বিয়েটা দিয়ে আপদ বিদায় করতে রাহেলা নিজের মনে কিছুক্ষন ভাবতে থাকে। পয়ষট্টি বছর! এ যে বাবার বয়েসী তবু তো সেখানে তার নিজের সংসার হবে, মেয়ের ভবিষ্যতের একটা ব্যবস্থা হবে রাহেলা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে একটাই কেবল শর্ত থাকবে এই বিয়েতে রাজী হবার, তার মেয়ের দায়িত্ব নিতে হবে এই শর্তে নিঃসংগ বৃদ্ধের আপত্তির কোন কারন ছিলো না বিয়েটা হয়ে গেলো তাদের

আবার সংসারে প্রবেশ করলো রাহেলা বহুদিন পর কর্তৃত্ব হাতে পেলো তার ছয় বছরের ছোট্ট মেয়েটিকে নতুন স্বামী অনাদর করলো না মোটেই নিজের ওই বয়েসী নাতি আছে, সমস্যা কি! নতুন চার ছেলেমেয়ের সাথে পরিচিত হলো রাহেলা ছোট মেয়েটা ছাড়া বাকি প্রত্যেকেই তার চেয়ে বয়েসে অন্তত পাঁচ-ছ বছরের বড় ছোটটা তার সমবয়েসী বড় ছেলে একমাত্র খুশি হলো বাপের বিয়েতে। বাপের সাথে থাকার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলো সেকিন্তু বাকি ছেলেমেয়েরা বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে তাকায় তার আর তার মেয়ের দিকেতাদের মন রক্ষা করার জন্য কি করবে ভেবে পান না রাহেলা বেগম এটা রাঁধেন, সেটা রাঁধেন সারা দিন তাদের খেদমতেই পার করে দেন অবশেষে খালাসম্বোধনের সম্মান পান তিনি মেয়েদের কাছ থেকেও বাপের বিয়ের পরের কটা দিন ভাব গতিক বুঝে একদিন ছেলেমেয়েরা চলে গেলো যার যার নিজের বাড়িতে

রাহেলা নিজের সংসার পেলেন পরিপূর্ণভাবে না, তার কোন অভিযোগ নেই বৃদ্ধ স্বামীর উপর আগের স্বামীর সাথে তুলনা করলে রীতিমতন ফেরেশতা বলা যায় কেবল কিছু বাড়তি শাসন, সেগুলোও গায়ে মাখেন না রাহেলা বেগম বরং স্বামীর পরামর্শে এখন বোরকা পরে, পান খান যাতে বয়সটা একটু বেশি মনে হয় লোকের কাছে আবার তারই পছন্দে চোখে কাজল পরেন ঘরের ভেতর! একসাথে টিভি দেখেন মজা আর রোমান্সও করার চেষ্টা করেন রাহেলা বেগমের ছোট্ট মেয়ে নীলা প্রথম কদিন এই নতুন বাড়িতে তাদের অবস্থান ঠিক বুঝে উঠতে পারে নিতাকে শেখানো হলো নানার মত দেখতে এই লোকটাই এখন থেকে তার বাবা, ধীরে ধীরে সে বুঝে নিলো এটা এখন তাদেরই বাড়ি সে তার ইচ্ছামত ঘোরে ফেরে স্কুলে যায়, কেউ তাকে কিছু বলে না, কেবল তার নতুন বাবার বড় বড় ছেলে মেয়েগুলো এ বাড়িতে এলে তাকে খুব চুপচাপ থাকার নির্দেশ দেয় তার মা রাহেলার ভয় কোন দিন যদি তাকে বাড়তি মনে করে ঝেড়ে ফেলে দিতে বলে তারা! রাহেলা ভাবে কোনভাবে যদি তার মেয়ের নামে বুড়োর কাছ থেকে কিছু সম্পত্তি লিখিয়ে নেয়া যেতোকবে দুম করে মরে যাবে তখন কি আর এই ছেলেমেয়েরা তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখবে? ভেবে ভেবে মেয়েদের আর বুড়োকে পটানোর নতুন বুদ্ধি করতে থাকেন তিনি মনে মনে...

সহসা পোড়া গন্ধে চমকে ওঠেন রাহেলা বেগম নাহ, ভাতটা লেগে গেলো হাঁড়ির তলায় রান্না শেষ নতুন করে আর রান্না না করে এই ভাতটাই খাবেন ঠিক করলেন। নইলে দেরী হয়ে যাবে। বেশ তো দেখতে সাদা, কেবল একটু পোড়া গন্ধওয়ালা

 

- অলঙ্করনে ব্যবহৃত ছবিটি লেখিকার আঁকা।