name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

বিপুল দাস
কান্নায় আলাদা মাত্রা এনে দেয়

অন্যান্যদের গল্প

সুমেরু মুখোপাধ্যায়

নিঘাত সুলতানা তিথি

বিপুল দাস

হাসান মোরশেদ

 

দুপুরের কথা

গ্রীলের ফাঁক দিয়ে দেখেশুনে দুবার পানের পিক ফেলল সুবিনয়। এবার সিগারেট ধরাবে। তাদের এদিকে মনে হয় পোলিং ভালোই হচ্ছে। সিগারেট বা পানের নেশা তার নেই। ওই যেদিন মাংস টাংস হয় । আজ সিগারেটটা বেশ জম্পেশ করে টানতে হবে। পোলিং বেশ ভালোই হচ্ছে, নখের আর চামড়ার মাঝে বেগুনি কালির দাগটা একটু ছড়িয়ে পড়েছে। এবার অনিমাকে পাঠাতে হবে। সকালে মেয়েদের লাইনে বেশ ভিড় ছিল। এখন নিশ্চয় ফাঁকা হয়েছে।

-অনু

-ডাকছ?

-বেশি দেরী কোরনা। খাওয়া হয়েছে তোমার?

-হ্যাঁ, এই তো ---

-একা যাবে না আমি সংগে যাবো?

-না, আমি আর বেবির মা একসংগে যাবো। ও আমার জন্য সকালে গেলনা।

-বেবির মা কেন ? অলীকবাবুর মিসেস কে তো বলে রাখলেই পারতে।

-ওরাতো সকালেই ভোট দিয়ে এসেছে।

-ও, ঠিক আছে। সেই মুগা কালারের পিওর সিল্কটা পরে যেও। আর লেক্সপো থেকে যেটা কিনে দিয়েছিলাম সেটা পায়ে দিও।

অনিমা উত্তর দিলনা। সুবিনয় তাকে আজকের কর্তব্য বিষয়ে আরও অনেক কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। অনিমা রেডি হয়ে বেবির মার সাথে ভোট দিতে গেল। সুবিনয় তখন বাথরুমে ছিল। দেখেনি অনিমা নিজের পছন্দের একটা সুতির শাড়ি পরেছে। দেখলে সুবিনয় ভীষন অবাক হত।

সিগারেট দেশলাই এর ওপর দুবার ঠোকে সুবিনয়। পা দুটো তুলে দেয় সেন্টার টেবিলে। দুশো ছেচল্লিশটি ঘর্ষনবিন্দুর ওপর কাঠি চালায়, সিগারেট ধরায়। সুখ ছড়িয়ে পরে সুবিনয়ের মুখের রেখায়। আঃ মাংস রান্না অনিমা বেশ ভালোই শিখেছে। প্রথম যখন এল চা-বাগান থেকে, একেবারেই আদিবাসীগোছের ছিল। সুবিনয় দত্তর শিক্ষার গুনে এখন সে পার্টিতে প্রয়োজনে নাচতেও পারে। আর কী সব ওল্ড ট্যাবুস ছিল। সুবিনয়ের শরীরে অসাবধানে পা লেগে গেলেও প্রনাম করত। সেটা অবশ্য ভেতরে ভেতরে সুবিনয়ের খারাপ লাগতনা। মাঝে তো সন্তোষী মার উপোষ করার জন্য খেপে উঠেছিল। সদ্য জংগল থেকে ধরে আনা বুনো ঘোড়া যেমন ঠিক সেইরকম। সার্কাসের দক্ষ ট্রেনারের মত সুবিনয় তাকে মার্জিত করে তুলেছে। যা ছিল উদ্ধত কেশর, সেখানে এসেছে নিখরি নিখরি গুলাব য্যায়সি আনুগত্যের সিল্ক-পেলবতা। বল্গাহীন উদ্দাম পাগলাঝোরা সুবিনয় দত্তের রুচির কারুকুশলতায় হয়েছে নন্দনের স্নিগ্ধ ফোয়ারা। যা ছিল ডুয়ার্সের গাঢ় সবুজ বুনো গাছ, সে শরীরে এখন ল্যাভেন্ডারের সুবাস। এখন অনিমার দ্বিধাহীন সমর্পন; প্রশ্নহীন কর্তব্যপরায়নতা দেখলে সুবিনয় নিজের কর্মকুশলতায় মুগ্ধ হয়ে যায়। সত্যি, মেয়েদের মন কত নরম, কী সুন্দর ছাঁচে পরে যায়। সুবিনয় সিগারেটের আগুন পায়ের তলায় পিষে তুলে জানলা বাইরে ফেলে দিল। এই অনিমাকে সেই বানিয়েছে। সেন্টার টেবিলের ওপর দুবার সে তেরে কেটে তাক বাজায়। মনে হয় তার নিজের পিঠের ওপরেই বোল ফুটছে।

অনিমা সকাল থেকেই টের পাচ্ছিল আজ সুবিনয়ের শরীরে মনে উত্তেজনা একটা গোপন স্রোত বইছে। এর ফল কী হবে, অনিমা জানে। কিন্তু কারনটা বুঝতে পারছিলনা। সুবিনয়ের হাবভাব চালচলন দেখে অনিমা বোঝে আজ রাতে সুবিনয়ের নখদাঁত সব হিংস্র হয়ে উঠবে। আজ মাটির পুতুল ধূলো হবে, তবু সেই ধূলো দুহাতে ঘাঁটাঘাটি করে ভয়ংকর পাশবতায় সুবিনয় সেখানে প্রান খুঁজবে। মাটির ভেতর ধুলোর ভেতর সজীব প্লোটপ্লাজম হাতড়ে মরবে। প্লিজ অনু, একটু জেগে ওঠো, এই কাতর বাক্য কখনও শোনা যায়। অনুর শরীর তখন অপমানের, বঞ্চনার যাঁতাকলে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যায় ঘরের অন্ধকারে। তীব্র কোনও বিষে নীল হয়ে যায় চা-বাগানের বড়বাবুর মেয়ে। বিবশ হতে হতে দেখে মার্জিত যুবার মুখোশের আড়ালে চতুর লেপার্ডের মুখ। অবশ হরিনীর মত দেখে মূর্তি নদীর পাড়ে সেই ছোটবেলায় দেখা পাইথন আড়মোড়া ভাঙছে। যন্ত্রনায় দীর্ন হতে হতে অনিমা ধুলো হয়ে অন্ধকার ঘরে ব্যস্ত হয়।


রাতের গল্প

-বাসন রেখে দাওনা, কাল সকালে বেবির মা মাজবে।

-এই তো, দুটো মাত্র থালা। এখনই হয়ে যাবে।

-তোমার পান রয়েছে কিন্তু। ফ্রিজে রেখে দিয়েছি।

-তুমি খেয়েছো?

-না, তুমি এসো। একসংগে বারান্দায় বসে খাব।

অনিমা জানে এসবই ভনিতামাত্র। ওৎ পাতছে। লেজে পাক দিচ্ছে। আজ সুবিনয় নিজেই বিছানা পরিস্কার করেছে, মশারি টাঙিয়েছে। দরজাটরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে অনিমা বিছানায় এল।

-তোমাদের লাইনে ভিড় ছিল না কি?

-বেশি নয়। আমার সামনে পাঁচ ছজন ছিল।

-হাওয়া কেমন বুঝলে?

-দাঁড়াওনা, ছিঁড়ে যাবে তো।

দীর্ঘ উপোসী বুনো একটা পাইথনের মত সুবিনয় দত্ত নামক ইন্টেলেকচুয়াল শহুরে পাক খুলতে থাকে। প্রবাদের মত নিশ্বাসে টানে হরিনী। অনিমা প্রথমে অনু, পরে পরমানু হতে থাকে। কিন্তু সুবিনয়ের বিস্ময় জাগে আজ। অনিমার ভেতরে আজ এত প্রান, এত জেগে ওঠা! আজ কোথাও যেন মাটির গন্ধ নেই। শুধু এক জৈব উপস্থিতি সুবিনয়কে জীবনে প্রথমবার এক অন্য সুখ, অন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়।

-যেখানে বলে দিয়েছিলাম, সেখানে ছাপ দিয়েছিলে --- মানে কাষ্ট করেছ তো?

-উম্‌, পরে বলব।

-বলনা, সেখানেই তো দিয়েছ?

-উঁহু, আমি আমার নিজের পছন্দের চিহ্নে কাষ্ট করেছি।

মূহুর্তে অনিমা টের পায় সুবিনয় দৃঢ়তা হারাচ্ছে। অনিমা দেখে, সুবিনয় কেমন ভেঙে যাচ্ছে। ক্রমশঃ শিথিল সুবিনয় যেন কোনও আগুনে বাষ্পিভূত হতে থাকে, অথচ শীত করে। আর অনিমা ক্রমশ ভয়ংকর হতে থাকে। লক্ষ বছরের খিদে নিয়ে গ্রাস করতে চায় সুবিনয় দত্ত নামক প্রতিষ্ঠানকে। সুবিনয়ের শরীর পোড়ে অথচ বুকের ভেতরে হাড়হিম হয়ে যাওয়া বরফের ছোঁয়া। তাপমাত্রার এই তীব্র বৈপরীত্যে তার চামড়ায় ফাটল ধরে। তার মনে হয়, কবে বোধন হল এই চিন্ময়ীর? কে করল প্রাণপ্রতিষ্ঠা? সে চতুর্দিকে কাশফুল দেখে ও ঢাকের বাদ্যি শুনতে পায়।

টুকরো টুকরো হয় সুবিনয় দত্ত। ঘরের ভেতরে এবং বাইরেও সহস্র ঢাকের আওয়াজ শুনতে শুনতে, ফেটে পড়তে পড়তে সে কেন্দ্রে ভোটের রেজাল্ট বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে।