name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

 

 

বিপুল দাস
 
  বৃহৎ ছাগতন্ত্র 

 

 

 

অন্যান্যদের গল্প

অলোক গোস্বামী

আনোয়ার সাদাত শিমুল

দেবাশিস চক্রবর্তী

বিপুল দাস

শিবাশীষ রায়

শুভময় সরকার

 

।। ।।  মেসেজ এসেছে মোবাইলে 

খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে, মোবাইলে সবাই মেসেজ পাঠায়। এখন পর্যন্ত আমি খুব কমই দেখিয়াছি যে মেসেজ আসিতেছে বা কেহ পাঠাইতেছে। মেসেজ, যাহা কিনা আদতে ম্যাসাজ – আমি জানিতাম অপ্রেরণীয়। প্রেরণামূলক হইলেই প্রেরণীয় হয় না। তদ্ব্যতীত, শব্দটির কেমন একটি আমিষ অনুসঙ্গ আছে। গরমমশল্লার ক্ষীণ গন্ধ পাই। আর কে না জানে মানুষ আবহমানের পাঁঠাবিলাসি। ভালোবাসিয়া মানুষ গুহাগাত্রে পাঁঠার ছবি আঁকিয়াছে। এসো পাঁঠা বলিয়া কাঁঠালপাতার নৈবেদ্য সাজাইয়াছে। রবিবারে সেই শ্বাশত নাইলনের ব্যাগ লইয়া তাহার গোলাপি দাবনার প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ফেলিয়াছে। ইহাই মানুষের আসল প্রবৃত্তি। সুতারাং মোবাইলের টিপবোতামে টিপ করিয়া প্রেশার দিবার সময় বোধহয় ম্যাসেজের কথাই মনে পড়ে। না হইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তো কোন ছার, আমার ঠিকাদার, এস্তেক আমার অফিসের আর্দালি নিতাই-এর পর্যন্ত ম্যাসেজ আসে। কয়েক দিন পূর্বে বিল সেকশনের জয়ন্তী ক্যান্টীনের এক কোণে বসিয়া বোতাম টিপিতেছিল। তাহার সদ্য বিবাহ হইয়াছে। আমাকে দেখিয়া কিঞ্চিৎ লজ্জা পাইয়া বলিল – আর বলবেন না, বলে দিয়েছে, টিফিনে ম্যাসেজ পাঠাতেই হবে। মনে মনে ভাবিয়া অবাক হইলাম। দ্যাখো কান্ড! বিজ্ঞানের অসাধ্য আর কিচ্ছুটি রইল না গো। 

।।২।।  পাঁঠায় পাঁঠায় ধূলপরিমান 

ইদানিং বাঙ্গালী পাঁঠার দোকান বিশেষ দেখা যাইতেছে না। এই ব্যাবসায়ে বাঙ্গালী পিছাইয়া পড়িতেছে। অপরজন দোকান খুলিতেছে। বাঙ্গালী খরিদ্দাররূপ পাঁঠা হইয়াছে। অন্যের দোকানে গিয়া ঠকিবেন কেন? আমাদের দোকানে আসুন – এই মর্মে শহর জুড়িয়া বিজ্ঞাপন দেখিতে পাই। বাংলা বাদে অন্য সমস্ত ভারতীয় ভাষায় উহা লিখিত। বাঙ্গালী পাঁঠা এখন খরিদ্দার হইয়া পাঁঠি সমভিব্যাহারে মুগাসিল্ক, তানচৈ, বালুচরীরূপ কাঁঠালপাতা দেখিয়া বধ্যভূমিতে প্রবেশ করে। জয় মা মঙ্গলচন্ডী। বাঙ্গালীর আর পূর্বের সেই পাঁঠাত্ব নাই, কিংবা কে জানে – পাঁঠারই হয়তো বাঙ্গালীত্ব কমিয়াছে। পূর্বে আমরা আর্যা পড়িয়াছি পাঁঠায় পাঁঠায় ধূল পরিমান। সেই দিন আর নাই। তখন ইলেক্‌ - এর একটি মূল্য ছিল। এখন ইলেক্‌ তাহার পশ্চাতে শন জুড়িয়া সমুদয় খাঁটি পাঁঠা বিনাশ পূর্বক ব্রয়লার পাঁঠা তৈয়ারীর জঘন্য ষড়যন্ত্র করিয়াছে। ইহার পশ্চাতে কেন্দ্র আছে। উহারা চায়না বঙ্গদেশে পাঁঠার কুলীনত্ব বজায় থাকুক। কেন্দ্র চিরকাল বাঙ্গালীর তথা বাঙ্গলার চরিত্র হণন করিয়াছে। তা সে পাঁঠা হউক, নেতা হউক আর খেলোয়াড় হউক। আমরা উহাদের নিন্দা করি। আমাদের নিন্দায় পরজন্মে উহারা বুকে কফ জমা রোগীর রুমাল হইয়া জন্মাইবে। ছিঃ। 

।।৩।।  শ্রেণিবিভাগ 

কামরূপ হইতে প্রাপ্ত বৃহৎ ব্যাঁ তন্ত্র গ্রন্থে পাঁঠাচরিৎ বিষয়ে অনেক কিছু জানা গিয়াছে। সিদ্ধ সাধক পাঁঠার ডাক শুনিয়া বুঝিতে পারেন ইহা অরিজিন্যাল পাঁঠা, নাকি পূর্বে মানুষ ছিল, পরে কোনও ছলনাময়ীর ছলে পাঁঠা হইয়াছে। শুনিয়াছি দেশের বাড়িতে আমার দাদামহাশয় এই সাধনায় অনেকদূর অগ্রসর হইয়াছিলেন। আমার সমস্ত মাতুল সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত হইয়াছিল। আমার মা দাদামহাশয়ের সম্পত্তি পায় ও পরে বাবার গলার আওয়াজ পাল্টাইয়া যায়। কিন্তু দাদামহাশয় একমাত্র জামাতার কন্ঠ শুনিয়া যারপরনাই খুশি হইয়াছিলেন। 

আরও জানা যায় যে, ভারতীয় পাঁঠা প্রধানতঃ চারিপ্রকার (ভারতীয় পন্টকচরিৎমালা, ৩নং খন্ডেও একই আছে) – রামপাঁঠা, শ্যামপাঁঠা, যদুপাঁঠা ও মধুপাঁঠা। 

রামপাঁঠাঃ ইহারাই শ্রেষ্ঠ। সাধু প্রকৃতির। সাধারণতঃ শ্মশ্রুধারী হয়। শতবার ধুইলেও গায়ের গন্ধ মোচন হয়না। আসল কাঁঠালপাতা ও সিন্থেটিক কাঁঠালপাতা পৃথক করিতে পারে না। দৃষ্টি উদাস। চিন্তাশীল। নশ্বর পাঁঠাজীবন বিষয়ে ভাবিয়া থাকে। ভোরের দিকে দুই একবার ডাকিয়া থাকে। অজাচার বিষয়ে অভিজ্ঞ শ্রীযুক্ত কমল সেনগুপ্ত মহাশয় বলিয়াছেন – তখন উহারা ঠাকুর পন্টকেশ্বরের নাম লয়। বেলা হইলে আর এই ডাক শুনা যায় না। তাই তো কবি গাহিয়াছেন – তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে কেউ তা জানে না। 

শ্যামপাঁঠাঃ উগ্র প্রকৃতির। সাইজে একটু বৃহৎ। প্রকৃত পাঠান। খুঁটির জোরের তোয়াক্কা করেনা। শিংদার। যেখানে অনেক পাঁঠা বিচরণ করে, সেখানে উপস্থিত হইয়া, লড়কে লেঙ্গে পাঁঠিস্তান, বলিয়া হুংকার ছাড়ে। ক্ষত্রিয়ের সমস্ত লক্ষণ ইহাদের ভিতর দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হইল যে, ইহারা ফলস্‌ লড়াই করে। এমনভাবে ঘাড় বাঁকাইয়া শূন্যে দুইপা তুলিয়া ভঙ্গী করে – না জানি কী কান্ড ঘটিবে। শেষতক টুকুস করিয়া মাথায় মাথায় স্পর্শ হয় মাত্র। অনেকটা যাত্রাপালার তরোয়াল যুদ্ধের ন্যায়। শাস্ত্রে বলাই হইয়াছে – অজাযুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। কিন্তু বিজাতীয় কাহারও প্রতি বিদ্বেষ জন্মাইলে উহারা প্রকৃতই দূর হইতে ছুটিয়া আসিয়া পেটে আঘাত করে। ভরবেগের অঙ্ক কষিতে পারে, এরূপ একটি শিক্ষিত ছাগলের কথা পরশুরাম লিখিয়াছিলেন। সে খল্বিদং স্বামীর নধর পেটে আক্রমণ করিয়াছিল। তিনি আরও লিখিয়াছেন – তখন বোরিক কমপ্রেশ করিতে হয়। 

যদু ও মধু পাঁঠাঃ ইহারা নিতান্তই যোদো মোদো শ্রেণিভুক্ত। প্রকৃত জনগণ। গ্রামাঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। সর্বভূক। নটেগাছ খাইয়া ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। মধ্যযুগে ইস্টিলের কত্তাল, লব্বই টাকার লোট ও ব্যায়লার তাঁত খাইয়াছে। ইদানীং ভোটার লিস্ট, কিষাণ বিকাশ পত্র, বিভিন্ন সরকারি ফাইল খাইতেছে। দিনে দিনে উহাদের নোলা বাড়িতেছে। প্রতি রবিবার সন্ধ্যাকালে গৃহস্থবাড়ির নাছদুয়ারে অপেক্ষা করিতে দেখা যায়। কখন পরশপাথর পত্রিকার পাত উড়িয়া আসিবে, সেই আশায় পাত পাড়িয়া বসিয়া থাকে। উহাদের ডিসেন্ট্রি নাই। পাগল পাঁঠার কথাও অদ্যাবধি শুনি নাই। পাঁঠা বিষয়ে আরও অনেক কিছু জানা যায় না। যেমন, পাঁঠার মাংস পাঁঠা খায় কি না, কোন দ্রব্য পাঁঠার হজম হয় না, জন্ম হইতেই পাঁঠার মস্তকে চন্দ্রবিন্দু বসিয়া যায় – ইহা কি নিয়তির কোনও ইশারা ইত্যাদি। 

।।৪।।  আমার দাদামহাশয়

পাইয়াছি। সাতরাজার ধন এক মানিক পাইয়াছি।

দেশের বাড়িতে গিয়াছিলাম। আমার সেই সাধক দাদামশাই-এর পুরাতন তোরঙ্গ নাড়াচাড়া করিয়ে গিয়া অমূল্য সম্পদ পাইয়াছি। আমার দাদামশাই বিরচিত, তাহার স্বহস্তে লিখিত ‘বৃহৎ ছাগতন্ত্র সার’। অতি সাবধানে বাড়িতে আনিয়াছি। রাত্রে নিশ্চিন্তে পড়িব। তিনি সাধক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। গাত্রবর্ণ পাকা চৌসা আমের ন্যায়। কলেজে বাংলা অধ্যাপনা করিতেন। আমি তাহার শ্বেতশ্মশ্রু দেখিয়াছি। গ্রামে সাধু মাস্টার বলিয়া পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করিবার পর পাঁঠা বিষয়ে আরও জানিবার জন্য নিবিড় গবেষনা প্রকল্পে হাত দিয়াছিলেন। শুধু পাঁঠা নয়, তিনি বেবাক ছাগজাতি বিষয়েই অর্থাৎ পাঁঠা, পাঁঠি ও তৃতীয় প্রকৃতির ছাগ (খাসি) লইয়া গবেষণা শুরু করিয়াছিলেন। জীর্ণ লালশালুর গিঁট খুলিয়া পড়িতে শুরু করিলাম। 

                                    ওঁ অগ্নিবাহনায় নমঃ।

                                    ছাগের খোঁয়াড় সব স্থাপি ঘরে ঘরে।
                                    রাখিবে যতেক ছাগ মঙ্গলের তরে।।
                                    মাসে মাসে ছাগসংখ্যা বাড়িবে নিশ্চয়।
                                    ছাগ হইল শ্রেষ্ঠ জীব, ইবে নাহি ক্ষয়।।
                                    ছাগ ধর্ম ছাগমোক্ষ ছাগ-ই হৈল সার।
                                    ছাগ ব্রহ্মা ছাগ বিষ্ণু আর সব বেকার।।
                                    ছাগদুগ্ধ রৌদ্রে দিয়া বানাও অজাক্ষীর।
                                    ছাগপূর্ণিমায় সেব্য, কহেন সাধুপীর।
                                    এ মায়াপ্রপঞ্চ ভরে ঊনকোটি ছাগ।
                                    দিবানিশি ব্যাবাইতেছে ছাগবরী রাগ।।
                                    সোম শনি দিবারাত্র উঠিতে বসিতে।
                                    গাহ ছাগ্যায়নী কথা গ্রীষ্মে কিংবা শীতে।।
                                    ক্ষান্ত হই সুগৃহিনী দেখায় রক্তআঁখি।
                                    বাখানির অন্য পত্রে যাহা রৈল বাকী।।
                                    এতেক বলিয়া মঞ্চি জাবালি মোহন।
                                    প্রণমি তাঁহার খুরে সঁপি প্রাণমন।।
                                    দাও প্রভু খুর হইতে এক কাচ্চা ধূলি
                                    অন্তিমেতে মুখে দিও তোমার মেটুলি।।
                                    জয় ছগনলাল ছাগরাজ জয় ছাগানন্দ। 

বিগত দশ বৎসর যাবৎ নিকট হইতে উহাদের পর্যবেক্ষণ করিতেছি। যতই দেখি ততই বিষ্ময় জাগে। এই নির্বিকার প্রাণী যদি হইতে পারিতাম, সংসারের সহস্র শোকতাপ, সুখদুঃখ, রোগভয়, ক্রোধ হইতে মুক্ত হইতাম। গতমাসে এগারো নং পাঁঠা ও পনেরো নং পাঁঠা আমার ঘরে ঢুকিয়া এক বান্ডিল পরীক্ষার খাতা খাইয়াছিল। সধবা পাঁঠি। দুইটি বর্কর আছে। দুধের পরিমান দ্বিগুন হইয়াছে। এগারো নং – এর তেজ বাড়িয়াছে। এক মাসেই দাড়ি প্রায় দ্বিগুন লম্বা। চক্ষুর দৃষ্টি আর পাঁঠাসুলভ নাই। একদিন, বারান্দায় বসিয়া পরীক্ষার খাতা দেখিতেছিলাম এগারো নং মুড়ির লোভে সামনে আসিয়া হঠাৎ ‘উম ম্যাঁ’ বলিয়া মরণ আর্তনাদ করিয়াই তীরবেগে খোঁয়াড়ে ঢুকিয়া পড়িল। সম্ভবত মানসিক ভারসাম্য হারাইয়াছে। এ দিগরে পাঁঠার ভাল চিকিৎসা নাই, কলিকাতা না যাইতে হয়। 

কিছুদিন যাবৎ শরীর ও মনে এক পরিবর্তন লক্ষ্য করিতেছি। অধ্যাপনা ছাড়িয়া দিব। প্রথম রিপুর প্রাবল্যে শরীর আইঢাই করে, কপালের দুই পার্শ্বে মাথার উপরে ব্যাথা করে। কাঁঠালপাতা দেখিলে মুখ শর্করাভঙ্গক উৎসেচকে ভরিয়া যায়। গৃহিনী কিছুদিন যাবৎ ভিন্ন ঘরে শুইতেছে। তবে কী ... 

দাদামশাই – এর পান্ডুলিপি তাহার বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। পরে বিস্তারিত লিখিব। তবে শেষ জীবনে দাদামশাই–এর নিখোঁজ হইবার রহস্য মনে হয় ভেদ করিতে পারিব।  

।।৫।।  সাহিত্যে পাঁঠাদের অবদান 

প্রাচীণকাল হইতে অদ্যাবধি পাঁঠা শুধু মানবজাতির দেহের ক্ষুধা নয়, সাহিত্যে উপজীব্য হইয়া মনেরও ক্ষুধা নিবারণ করিয়াছে। ইল্বল বাতাপির গল্পে আমরা উহাদের পাই। পঞ্চতন্ত্রে আছে। পরশুরাম লম্বকর্ণের কথা লিখিয়াছেন। সুকুমার রায় ব্যাকরণ শিং–এর করুণ কাহিনি বর্ণনা করিয়াছেন। শরৎবাবু নাই। থাকিলে একটি বঞ্চিত পাঁঠা লইয়া মহেশ – এর মত আরও একটি গল্প কি তিনি লিখিতেন না। গনেশ বা ভবেশ নামক সেই গল্প শিক্ষাবোর্ড অবশ্যই সিলেবাসের অন্তর্গত করিত। 

ধরা যাক, কলিকাতায় দীর্ঘদিন বৃষ্টি হয় নাই। পথের পিচ গলিয়া টায়ারে জড়াইতেছে। টায়ার মোটা এবং পথ দাগড়া দাগড়া হইয়াছে। তাপমাত্রা ক্রমশ ঊর্দ্ধমুখী। আলিপুর হইতে বলিতেছে তাহাদের সমস্ত থার্মোমিটার ফাটিয়া অফিস পারদপূর্ণ। শুধু একটি টেবিল পারাদ্বীপের ন্যায় জাগিয়া আছে। তবে ভয় নাই। মিরিকে একটি ব্যাং ডাকিয়াছে। কেশপুরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষক দল একদল পিঁপড়াকে খাদ্য মুখে লইয়া গাছে উঠিতে দেখিয়াছে। বৃষ্টি আসিল বলিয়া। উত্তরবঙ্গের একজন মন্ত্রী দক্ষিণবঙ্গের একজন মন্ত্রীকে বেসরকারিভাবে হুদুমদেও পূজার পরামর্শ দিয়াছে। দঃ মন্ত্রী লোক – folk এর সচিব দিয়া ঘোষকে ব্যাপারটি সম্পর্কে খোঁজ লইতে বলেন। কিন্তু যে সমস্ত সিরিয়াল–অভিনেত্রীর নিকট পূজা সম্পন্ন করিবার প্রস্তাব রাখা হইয়াছিল, তাহারা পূজাপদ্ধতির বিবরণ শুনিয়া লজ্জায় অধোবদন হইয়াছে। 

রাত্রি আট ঘটিকা। ময়দানের অন্ধকারে একটি ঝোপের পাশে একটি মধু পাঁঠা বসিয়া বসিয়া ধুঁকিতেছে। সমস্ত ঘাস খয়েরি হইয়াছে। কোথাও আর সবুজের নামগন্ধ নাই। সবুজ রং এর সরকারি বাস এবং বেসরকারি সাইনবোর্ডগুলিও পাংশু হইয়াছে। দক্ষিণ হইতে যে বাতাস আসিতেছে, তাহাও যেন একটি তাপপ্রবাহ। মেটিয়াবুরুজে দুইটি মুরগি সিদ্ধ ডিম পাড়িয়াছে।

মধু পাঁঠার পাশে একটি মাধ্বী পাঁঠি। সে মাঝে মাঝে নীচু হইয়া পরম মমতায় পাঁঠার শরীর চাটিয়া দিতেছে। হঠাৎ সেখানে একটি পুলিশ আসিয়া প্রথমে অশ্লীল গালি দিল। পরে যখন নিকটবর্তী হইয়া দেখিল পাঁঠাপাঁঠি, মানুষ নহে – তখন তীব্র হতাশায় সে তীব্রতর গালি দিল। পাঁঠারও আর সহ্য হইল না। একে তো প্রকৃতির এই রুক্ষ রূপ, কোথাও সবুজ ঘাস নাই, কোনকালে কাঁঠালপাতা খাইয়াছিল – মনেও পড়ে না, তাহার উপর পুলিশের এই নিষ্ঠুর গালিগালাজ।  মুহূর্তে তাহার শিং-এ রক্ত চড়িয়া গেল। সমগ্র মনুষ্যজাতির উপর যুগযুগান্তের সঞ্চিত ঘৃণা শিং দুইটিতে সন্নিপাত করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। অপসৃয়মান পুলিশের পশ্চাদ্দেশে মারিতে গেলে (ঢুঁ) যে শক্তি দরকার, এই আকালের দিনে দুর্বল দীন দরিদ্র পাঁঠা কোথায় পাইবে। 

পুলিশ আশ্চর্য হইয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইল এবং হাতের লাঠি সপাটে চালাইল। পাঁঠার মাথায় যে সামান্য রক্ত অবশিষ্ট ছিল, সেই রক্ত বাহির হইয়া আসিতেছে। রুক্ষ কলিকাতার শুষ্ক ঘাস ভিজিয়া যাইতেছে বোকা পাঁঠার রক্তে। এইরূপে চিরকাল বঞ্চিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত যদুমধুরা মরিয়া যায়। ইতিহাস ইহাদের কথা লিখে না। তখন কলিকাতা হইতে একটি গরম বাতাসের স্রোত পাক খাইয়া উপরে উঠিয়া যাইতেছে। ঈশান কোণে কালো মেঘ। রাক্ষসী শহর গরীব পাঁঠার রক্ত খাইয়াছে। এখন তাহার পূজা সমাপন। এখন বৃষ্টি নামিবে। যবতক গঙ্গায় পানি বহে, তবতক গড়েঁশ অমর রহে। গনেশ তোমায় ভুলছি না ভুলব না।...। 

।।৬।।  ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাগদুগ্ধের ভূমিকা। 

এ বিষয়ে বিশেষ কিছুই বলিবার নাই। প্রায় সকলেই বিস্তারিত জানেন। যাহারা জানেন না, তাহারা, যাহারা জানেন তাহাদের নিকট জানিয়া লইবেন। ...। 

।।৭।।  একবার প্রাণভরে ব্যা ডাক দেখি তুই 

দেশে আর প্রকৃত পাঁঠা নাই। নকল পাঁঠায় দেশ ভরিয়া গিয়াছে। ইহারা বুক ফুলাইয়া একবার ব্যা বলিয়া ডাকিতে পর্যন্ত পারে না। সকলে দিবারাত্র ম্যাঁ ম্যাঁ করিয়া ম্যামায়। প্রকৃত নেতার অভাব। ‘জাগো’ বলিয়া হাঁক দিতে ইহাদের খোঁয়াড় হারাইবার ভয়। হাঁক দিলেও সবাই শুনে, ভাগো। মাগো!...। 

।।৮।।  শেষের সেদিন 

আমার গৃহিনীর একটি পাঁঠা পুষিবার সাধ হইয়াছে। ম্যা ম্যা করিয়া বলিলাম, আবার একটা কেন। পুষিতে হইলে টিয়া ময়না কাকাতুয়া আছে। শিখাইলে কাঁটা লাগে পর্যন্ত শিখিবে। কুকুর আছে, বাড়ি পাহারা দিবে। এমন কী কুমির পর্যন্ত লোকে পুষিয়া থাকে। গৃহিনী শুনিল না। কচি পাঁঠা সে পুষিবেই। হ্যাঁ গো, আমি যখন টিভি দেখব, আমার কোলের কাছে বসে আমার শাড়ির ডগা চিবুবে। বুঝিলাম, ধুমসি এখন আশ্রমবালিকা সাজিতে চায়। প্রথমে কালিদাস, পরে বিদ্যাসাগর, শেষতক শিক্ষাবোর্ড আমার এই সর্বনাশের মূলে। মনে মনে বলিলাম, সে বয়েস আর নেই রে তোর। মুখে বলিলাম, ম্যা ম্যা ম্যাক্সি পরে বোসো তাহলে। আর পাঁঠা পোষার কী দরকার। হরিণ হলেও কথা ছিল। আমি তোমার দুষমন তো নই, তোমার ভালর জন্যই বলছি। 

কচিপাঁঠা শুনিয়া আমার বহুদিন পূর্বের একটি কথা মনে পড়িল। গ্রামের পাঠশালা হইতে পাশ করিয়া গঞ্জের হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হইয়াছি। তখন হাপিয়ালি পরীক্ষা গরমের ছুটির আগেই হইত। হাইবেঞ্চে বসিয়া প্রথম পরীক্ষা দিতেছি। স্যার খাতা দিলেন। খাতার উপরে অনেক কিছু লিখিতে হইবে। নেম, সাবজেক্ট, ক্লাস, সেকশন, রোল নং। সব ঠিকঠাক লিখিতে পারিলাম। শেষে দেখি – পেপার। বহুক্ষণ অচল থাকিয়া আকাশপাতাল ভাবিতে লাগিলাম। হাই স্কুলের প্রথম পরীক্ষা। ঘর ফাঁকা রাখিলে না জানি কী দোষ ঘটে। বিশেষত গ্রামস্থ সকলে, শিক্ষক মহাশয় ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা জানিত আমি গুড বয়। শেষে পেপারের ঘরে লিখিলাম, হোয়াইট। আমি জানি, আমি ছাড়া আর কেউ সেটি লিখিতে পারে নাই। 

ছুটির পর বিদ্যালয় শুরু হইলে পরীক্ষার খাতা লইয়া বাংলা স্যার আমাকে ডাক দিয়াছিলেন। খুব একপ্রস্থ হাসিলেন। বলিলেন, পাঁঠা। শেষে আমার চুলে হাত বুলাইয়া ভুল সামলাইয়া বলিলেন, কচি পাঁঠা। পরে তাহার হাত হইতে কলম পিছলাইয়া গিয়াছিল।  

গৃহিনীকে পাঁঠা আনিয়া দিয়াছি। অনেক পরিশ্রম হইয়াছে। জন্তুজানোয়ার যেখানে বিক্রয় হয়, প্রথমে সেখানে গিয়াছিলাম। উহারা পাঁঠা রাখেনা। তবে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাইলে গ্রাম হইতে জোগাড় করিয়া দিতে পারে। অগ্রিম দিয়া আসিয়াছিলাম। এক সপ্তাহ পরে খবর আসিল পাঁঠা আসিয়াছে। গৃহিনীর মুখে হাসি ফুটিল। দোকানে গিয়া দেখি পথের উপর একটি টেলিফোনের খুঁটির সহিত কুকুর বাঁধিবার চেন দ্বারা গলায় বকলশের সহিত বাঁধা। নিম্বাস মেঘের ন্যায় গাত্রবর্ণ। ঢুলুঢুলু দৃষ্টি। কান দুইটি কভারফাইলের ফ্ল্যাপের ন্যায়। দোকানদার হাসিয়া কহিল, তিনখান নাইরহোলের রশি খ্যায়া ফালাইছে। মনে হয় অ্যালসেসিয়ান। ডোবারম্যানও হোবার পারে।
- অ্যালসেসিয়ান পাঁঠা হয় না কি!
- হয় হয় M নে বুঝা যায় না। বড় হইলে দেইখেন, কেমুন ডাক পাড়ে। আর অ্যাকটা কথা, অ্যার সামনে ত্যাল সাবান গামছা রাইখেন না। দুই হাজার। টি এ ফাঁচাইওর। তিন খান রশি ছয় ট্যাহা।

আমাদের রেশন কার্ড আর নাই। বউ – এর আই লাইনার, আই শ্যাডো, মাস্‌কারা, লিপস্টিক – এর সেট, নেলপালিশ, ফেসপ্যাক, ভ্যানিশিং ক্রিম, কোল্ড ক্রিম, ময়েশ্চারাইজার, বারো পাতা বিন্দিয়া, আমার আফটার-শেভ লোশন, পেস্ট, গুঁড়াসাবান, আস্ত সাবান আর নাই। শুধু মেঘু আছে। গৃহিনী তাহাকে ‘দুত্তু কলেনা, মাব্ব’ বলিয়া মৃদু কান মলা দিয়াছে। মেঘুর গ্রাত্রবর্ণ এখন আরো মেঘবৎ। ফরাসি কেতার দাড়ি গজাইতেছে। শিং উঠিবে মনে হয়। গলার স্বর ভাঙিতেছে। গৃহিনী বকিলে সেও ব্যাঁ ও ম্যাঁ – এর মাঝামাঝি ভ্যাঁ বলিল। গৃহিনী তাহাকে কোলে তুলিয়া বুকের মাঝে চাপিয়া মুখচুম্বন করিলেন। মাটির দিকে তাকাইয়া ওয়ান টু থ্রী গুনিতে শুরু করিলাম। অব্যর্থ মুষ্টিযোগ। শৈশবে বাবার নিকট শিখিয়াছিলাম। বিশেষ কাজ হইল না। মনে মনে দেখি গোলাপি মেঘু পাড়ার মোড়ে উলটা হইয়া ঝুলিতেছে। গৃহিনীর কোল হইতে মেঘু আমার দিকে তাকাইল। তাহার চোখে বরাবরের প্রশান্ত নির্লিপ্তি নাই। বরং একটি কৌতুক খেলা করিতেছে। 

।।৯।।  পাঁঠা ও মাতাল 

কালীপূজার রাত্রে গৃহিনী বলিল ব্যালট কালীর মন্দিরে পূজা দিবে। বহুদিন পূর্বে কোনও এক ভোটের সময় এই মন্দিরে প্রচুর ব্যালট পেপার পাওয়া গিয়াছিল। তখন কাঁচা ঘর ছিল। পরে পাকা ঘর উঠিলে সর্বসম্মতিক্রমে ব্যালট কালীর মন্দির নাম হয়। যিনি ঐ বৎসর ভোটে জয়লাভ করিয়াছিলেন, অম্বুজা মজুমদার, পুরা সিমেন্টের ব্যয় নির্বাহ করিয়াছিলেন। 

মন্দির প্রাঙ্গনে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম দীর্ঘ লাইন। সকলের হাতে রশি। রশির অপর প্রান্তে পাঁঠা। উহাদের মানত ছিল, উৎসর্গ করিতে আসিয়াছে। মন্দিরে ঢাক বাজিতেছে।, চতুর্দিকে পটকা ফাটিতেছে, পথে টুনিবাল্ব জ্বলিতেছে। পাঁঠাগুলির কোনওরূপ চিত্তচাঞ্চল্য নাই। প্যাঁ ফ্যাঁ ব্যাঁ ভ্যাঁ ম্যাঁ কিছুই বলে না। একজনের হাতে কয়েকটি সবুজ রং –এর উৎসর্গ পত্র ছিল। সেইগুলি সে বিদায়লগ্নে পরম মমতায় আপন পাঁঠার মুখের সামনে ধরিয়াছে। গৃহিনী মন্দিরে প্রবেশ করিয়াছে। আমি বাহিরের দৃশ্য দেখিতেছি। হোথায় দীপাবলি, হেথায় পাঁঠাবলি। 

লাইনে হঠাৎ কুকুরের ডাক শুনিয়া দেখি এক ব্যক্তি কোথা হইতে একটি কালো কুকুর ধরিয়া রশি বান্ধিয়া লাইনে দাঁড়াইয়াছে। টলিতেছে। বুঝিলাম বিপিন বাবুর লোক। অমানিশায় ও কারণে ভেদাভেদ করিতে পারে নাই। এইরূপ হয়। 

ডাক শুনিয়া সে দার্শনিকের ন্যায় হাসিল। আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, দেখছেন, মরার আগে পাঁঠার আওয়াজ কেমন পালটে গেছে। সব ঠাকুরের ইচ্ছে। জয় মা ব্যালট কালী। 

প্রণাম করিবার জন্য সে জোড়হস্ত হইবে বলিয়া বহুক্ষণ ডানহাত দিয়া বাঁহাত এবং বাঁহাত দিয়া ডানহাত খুঁজিল। ডানপক্ষ ও বামপক্ষ সমান না হইলে বুঝা যায় সমীকরণে ভুল আছে। ইত্যবসরে রশি আলগা দেখিয়া কুকুর পলাইয়া গেল। 

।।১০।। মোবাইলের দেখা নাই রে 

গৃহিনী কেবল কান্দিতেছে। তাহার সাধের মোবাইল হারাইয়া গিয়াছে। অস্থানে কুস্থানে তন্নতন্ন করিয়া খুঁজিয়া দেখিলাম। মোবাইলের দেখা নাই। স্বান্তনা দিবার জন্য আর একটি কিনিয়া দিব বলিলে সে আরও জোরে কান্দিয়া উঠিল। মনে মনে বুঝিলাম, আমি যাহা সন্দেহ করিতেছি, সে ও তাহা সন্দেহ করিয়াছে। 

বারান্দায় রৌদ্রে খাটিয়া, খাটিয়ার উপর তোশক, তোশকের উপর কাঁঠালপাতা ছাপ বেডশিট, তাহার উপর মেঘু। মেঘুর মাথার উপরে ফ্যান দুই – এ মৃদুমন্দ ঘুরিতেছে। পাশে বসিয়া প্রথমে তাহার গায়ে মাথায় হাত বুলাইয়া দিলাম। অতঃপর তাহার পেটের উপরে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করিতে শুরু করিলে মনে হইল আরাম পাইতেছে। চক্ষু মুদিয়াছে। ফ্ল্যাপ পড়েনা। হাতে শক্ত কী একটা ঠেকিল। সর্বনাশ, তবে যাহা ভাবিয়াছি, তাহাই ঘটিয়াছে। পাঁঠা আমার গৃহিনীর মোবাইল খাইয়াছে। এখন কি উপায়! 

পেটের উপর দিয়া চাপ দিলাম। এখন বাহিরে কী হইল। মেঘু হাঁ করিল। প্রথমে মনে হইল পাঁঠা গান করিতেছে, তাহার মুখের নিকট কান পাতিলাম। ভিতর হইতে রিং টোন আসিতেছে। বিখ্যাত সেই গানের সুর। ইদানিং এই গানের সুর সর্বত্র শুনা যায়। অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে, বিবাহে, নিরস্তকরণে(divorce), বনভোজনে। বন্ধ করিবার জন্য তাড়াতাড়ি তাহার পেটের উপর চাপিয়া ধরিলাম। পাঁঠা বিধ্বংসী ঢেকুর তুলিল যেন ভিসুভিয়াস জাগিল। পাকস্থলী হইতে কিছু জলীয় পদার্থের সহিল মোবাইল তীব্র বেগে উর্দ্ধে উৎক্ষীপ্ত হইল। আরও দুইচারিবার লাভা উদ্‌গীরন করিয়া মেঘু শান্ত হইল। আমার দিকে তাকাইলে তাহার চোখে স্পষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখিলাম...।

।।১১।।   

(ক)  স্কটল্যান্ডে একপ্রকার বাদ্য আছে, তাহার নাম ছাগল বাঁশি।
(খ)  বাসি-ছাগল খাইয়া একবার হরেরাম অসুস্থ হইয়াছিল।
(গ)  হরেরামের তিন পুত্র। তৃতীয়টির জন্মের পর হরেরামের স্ত্রী মারা যায়। সন্তানটি বড় কষ্টে মানুষ হইয়াছে।
(ঘ)  পঞ্চদশ শতকে ইরান দেশে রচিত বাহার-এ-বকরিস্তান গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, পাঁঠার চর্বি ও উটের চর্বি ২:১ অনুপাতে মিশাইয়া খেজুরের ভিতর পুরিয়া একশ আশি দিন বালির নীচে রাখিয়া ব্যবহার করিলে যৌবন দীঘর্স্থায়ী হয়।
(ঙ)  রেওয়াজি খাসি নামক এক প্রকার প্রাণী আছে, উহাদের সম্পর্কে নানা আজগুবি গল্প শুনা যায়।
(চ)  ভারতীয় উপমহাদেশে পাঁঠা ‘বিপন্ন প্রজাতি’ হিসাবে ঘোষিত হইবার কোনও সম্ভাবনা নাই।
(ছ)  ছাগল দ্বারা কী আর লাঙল চাষ হয়।
(জ)  ছাগল মারিয়া পিন কুশন হয়।